Breaking News

মনের কুরবানিও করুন- হাফেজ মাওলানা জোবায়ের আহমাদ

তামাম তারিফ সেই ক্রান্তদর্শি সত্তার যিনি আমাদের উপর কুরবানি ওয়াজিব করেছেন। বেশুমার দরুদ ও সালাম মুসলিম জাতির হৃদয়ের স্পন্দন বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (স:) ও তার সাথীবর্গের উপর।
মুসলিম জাতীর দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আযহা দুয়ারে কড়া নাড়ছে, যা কুরবানির ঈদ নামে প্রসিদ্ধ। বিখ্যাত আরবী অভিধান মিসবাহুল্ লোগাত এর ভাষ্য অনুযায়ী কুরবানি শব্দের মৌলিক অর্থ হচ্ছে, প্রত্যেক ঐ বস্তু যার মাধ্যমে মহান প্রভুর নৈকট্য হাসিল হয়। চাই সেটা পশু হোক বা অন্য কিছুর মাধ্যমে। কুরবানির আরেকটি প্রসিদ্ধ অর্থ হচ্ছে ত্যাগ। উভয়টির সমন্বিত অর্থ হলো পশু বা ভিন্ন কোন বস্তু ত্যাগের বিনিময়ে শ্রষ্টার নৈকট্য হাসিল করা। ইসলামে অনেক ধরনের কুরবানি বা ত্যাগের বিধান রয়েছে:

 

 

 

১। জানের কুরবানিঃ যেমন- নামাজ, রোজা, হজ্জ, জিহাদ ইত্যাদির বিধান। এগুলো পালন করতে জানকে কিছুটা কষ্ট দিতে হয়। এমন কি জিহাদে গেলে জীবনই চলে যেতে পারে। এ সব হলো জানের কুরবানি ।
২। মালের কুরবানিঃ যেমন- যাকাত, ফিতরা, কুরবানী ইত্যাদির বিধান, এ সব বিধান পালনে মালের কুরবানি দিতে হয়।
৩। মনের কুরবানিঃ অর্থাৎ মনের চাহিদা ও খাহেশাতের কুরবানি । একটু গভীর ভাবে লক্ষ্য করলে বোঝা যায় জান ও মালের কুরবানীর তুলনায় মনের কুরবানি অনেক বেশি কঠিন ও কষ্টসাধ্য। মানুষ বিভিন্ন কারনে নিজের জান ও মাল সহজেই ত্যাগ করতে পারে কিন্তু মনের চাহিদা ও খাহেশ ত্যাগ করা সহজ নয়।
ধরুন, কারো সন্তান অসুস্থ হলে পিতা তার সমস্ত সম্পদ ত্যাগ করতে খুব দ্রæতই প্রস্তুত হয়ে যায়। কিন্তু মন যদি কোন খাহেশের পিছনে পড়ে তবে নিজ সন্তানকে হত্যা করতেও দ্বিধা করে না। রাসূলুল্লাহ (স:) এর যুগে মক্কার কাফেরগন মুসলমানদের বিরোধিতায় প্রচুর সম্পদ ব্যয় করেছিল। এমনকি যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে জীবন পর্যন্ত ত্যাগ করেছিল। কিন্তু মনের কুফর ও শির্ক এর চিন্তা ও ধ্যান ধারনা ত্যাগ করতে রাজী হয়নি। সব কিছু কুরবানী দিয়েছে কিন্তু মনের কুরবানি দিতে রাজী হয়নি। বোঝা যায় মনের কুরবানি সবচেয়ে বড় কুরবানি । ঈদুল আযহায় যে কুরবানি করা হয় সেখানে আমাদের কে পশু কুরবানির সাথে সাথে মনের কুরবানির করতে হবে।
পশু কুরবানির ক্ষেত্রে আমাদের মনে অনেক রকম ধ্যান ধারনা জন্ম নিতে পারে। পশু ক্রয়ের সময় অনেকের মনে এমন ধারনা পয়দা হয়। আমি হাটের সব থেকে বড় ও দামি পশুটি ক্রয় করব লোকে বলবে অমুক ব্যক্তি সবথেকে বড় ও দামি পশুটি ক্রয় করেছে। কুরবানির পশু ক্রয়ের ক্ষেত্রে এমন অসুস্থ প্রতিযোগিতা পরিহার করা সকল মুসলমানের অবশ্য কতর্ব্য। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন আত্ম অহমিকা পয়দা হচ্ছে তেমনি পশুর মূল্য বৃদ্ধিতে ও এটা প্রত্যক্ষ ভুমিকা পালন করছে। তাই প্রতিযেগিতামূলক পশু ক্রয়ের এই অমূলক ধারনাকে, পূর্বেই কুরবানি করতে হবে। কারন মনের এই গলদ খেয়াল ত্যাগ না করলে কুরবানির আমলে ইখলাস থাকবে না। আর ইখলাস শূন্য কোন আমল গ্রহনযোগ্য নয়।
কুরবানির বিধান প্রবর্তিত হওয়ার মূল হলো হযরত ইবরাহীম (আ:) এর পুত্র কুরবানি করার ঘটনা। সেখানেও মূল ছিল ইবরাহীম (আ:) এর মনের কুরবানী। প্রায় সারা জীবন নিঃসন্তান থাকার পর দীর্ঘ যাচনার নাড়ীছেড়া ধন হযরত ইসমাইল (আ:) কে প্রভূ কর্তৃক কুরবানির হুকুম কেবল মাত্র ইবরাহীম (আ:) এর মনের কুরবানি নেওয়ার জন্যই ছিল। নতুবা ইসমাঈল এর জবাই হয়ে যাওয়া যদি আল্লাহপাকের ইচ্ছা হতো তবে তো সেটা হয়ে যেত। এক দিকে ইবরাহীম (আ:) কে বলছেন নিজের কলিজার টুকরার গলায় ছুরি চালাতে অন্য দিকে ছুরিকে বলেদিলেন ইসমাঈলের একটি পশম ও যেন বিচ্ছিন্ন না হয়। কি আজব মহব্বতের খেলা? যেন ইসমাঈলের রক্ত চাওয়া হচ্ছেনা, বরং ইবরহীম (আ:) এর মনে গাইরুল্লাহর উপস্থিতির কুরবানি চাওয়া হচ্ছে, ফলে যখন সেটা পরিপূর্ন রুপে পুত্রের গলায় ছুরি চালানোর মাধ্যমে পাওয়া গেলো তখন প্রভূ জান্নাতী দুম্বা উপহার স্বরুপ পিতা পুত্রকে দান করলেন। ঠিক তেমনি আমরা যখন আমাদের মনে অলিক কল্পনার দীর্ঘ সমাবেশ ঘটাচ্ছি ঠিক তখনই আল্লাহ পাক মনের সব চাহিদা কুরবানি দিয়ে তার নিকটবর্তী হতে বান্দার প্রচেস্টা দেখতে চাচ্ছেন। যখন তিনি সেটা বান্দা থেকে পেলেন তখন পুরস্কার স্বরূপ ঘোষনা করলেন “তোমাদের (কুরবানির পশুর) গোস্ত, রক্ত কিছুই আমার নিকট পৌছে না। আমার নিকট পৌছে তোমাদের অন্তরের তাকওয়া। (সূরা হজ্জ, আয়াত-৩৭)
আর একটি গুরুত্বপূর্ন বিষয় হচ্ছে নবী ইবরাহীম (আ:) কর্তৃক ইসমাইল (আ:) কে কুরবানির করার হুকুমটি জাগ্রত অবস্থায় সরাসরি কিম্বা জিবরাঈল (আ:) মাধ্যমে প্রদান করা হয়নি, কেন? কারন এক্ষেত্রেও আল্লাহপাক ইবরাহীম (আ:) এর মনের কুরবানি চাচ্ছেন, যেন মনের অজান্তেই চলে আসা অলিক কল্পনা বা ধ্যান ধারনা মনে স্থান করে নিতে না পারে। নবী হলেও তিনি তো মানুষ। পুত্রের মহব্বতের আধিক্য এ ক্ষেত্রে চরম বাঁধার সৃষ্টি করতে পারত।
শুধু পিতার থেকেই নয় হুকুমের বাচন ভঙ্গির মাধ্যমে পুত্রের থেকেও মনের কুরবানি চাওয়া হচ্ছে। লক্ষ করুন “হযরত ইবরহীম (আ:) স্বীয় পুত্র কে বললেন, হে আমার প্রিয় বৎস্য! আমি স্বপ্নে তোমাকে জবাই করার বিষয় দেখেছি, তুমি ভেবে দেখ এখন কি করণীয়”। (সূরা সাফফাত, আয়াত-১০২)
আল্লাহর পক্ষ থেকে ইবরহীম (আ:) এর প্রতি কুরবানির হুকুম এসেছে এবং তিনি তা অবশ্যই পালন করবেন, পুত্র তাতে রাজী থাক বা না থাক। তার পরেও পুত্রের কাছে বিষয়টি পরামর্শের শুরে উপস্থাপন করে পুত্র ইসমাইলের মনের কুরবানি যাচনা করছেন। তিনি দেখতে চাইলেন, একটি কঠিন বাস্তবতার মুখোমূখি হয়ে ইসমাঈল তার মনের মধ্যে সৃষ্ট হতে চাওয়া ভীতি ও কুমন্ত্রনার কুরবানি করে কিনা। নাকি সে ভিন্ন কোন পথ খুঁজতে চায়? নবী পুত্র ও ভাবী নবী তিনিও ফেল করার পাত্র নন। তিনি জবাব দিলেন “হে আমার সম্মানিত পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে আপনি তা পালন করুন। ইনশাআল্লাহ নিশ্চয়ই আপনি আমাকে ধৈর্য্যশীলদের মধ্যেই পাবেন”। (সূরা সাফফাত, আয়াত-১০২)
হযরত ইবরাহীম (আ:) পুত্রের গলায় ছুরি চালিয়ে দিলেন কিন্তু দেখা গেল পুত্র কুরবানি হল না বরং তার স্থানে জান্নাতী দুম্বা কুরবানি হয়ে গেল তথাপি ইবরাহীম (আ:) মনের কুরবানির পরীক্ষায় শতভাগ উত্তীর্ন হলেন। বোঝাগেল পুত্রের কুরবানী হওয়াটা আল্লাহর অভিপ্রায় ছিল না। বরং ইবরাহীম (আ:) এর মনের কুরবারিই উদ্দেশ্য ছিল। দুনিয়া ও দুনিয়ার সকল আসবাবের চেয়ে আপন রবের মুহাব্বাত নবীর দিলের মধ্যে বেশি থাকবে এটাই ছিল এ কুরবানীর মূল হাকিকত।
কুরবানির এ হুকুম কে কিয়ামত পর্যন্ত বলবৎ করে দিয়ে আল্লাহপাক আজও আমাদের থেকে পশুর মাধ্যমে মূলত মনের কুরবানির কামনা করছেন। দুনিয়ার আসবাব ও সহায় সম্পদের মুহাব্বাত মন থেকে নিংড়ে বের করে দিয়ে এক মাত্র খালিক এর মুহাব্বাত মনে স্থান করে নিক এটাই খোদার একান্ত কামনা। মেহেরবানী তো এটাই যে, ইবরাহীম (আ:) এর ন্যায় প্রভূ আমাদের থেকে নিজ সন্তান কুরবানির মাধ্যমে আমাদের মনের পরীক্ষা নিচ্ছেন না। তাহলে হয়তো আমরা শতভাগ বান্দাই এ পরীক্ষায় ফেল করতাম। সামান্য কিছু নগণ্য ও তুচ্ছ মালের মাধ্যমে পরীক্ষা নিচ্ছেন এতেও যদি আমরা অকৃতকার্য হই তাহলেতো সত্যিই আমরা অকৃতজ্ঞ বান্দা বিবেচিত হব এতে কোন সন্দেহ নেই।
তাই আসুন সম্পূর্ন হালাল অর্থে, ইখলাস পূর্ন নিয়তে, মাওলায়ে পাকের সন্তুষ্টি ও নৈকট্য হাসিলের উদ্দেশ্যে পশু কুরবানীর সঙ্গে সঙ্গে মনের কুরবানিও পেশ করি। অবশ্যই আল্লাহ পাক আমাদের কুরবানী কবুল করে নিবেন ইনশাআল্লাহ।

লেখক: হাফেজ মাওলানা জোবায়ের আহমাদ
খতীব, বঙ্গবন্ধু দারিদ্র্য বিমোচন ও পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (বাপার্ড), জামে মসজিদ
কোটালীপাড়া, গোপালগঞ্জ।

Check Also

কোটালীপাড়ায় শিক্ষক কর্মচারী কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন লিমিটেডের নির্বাচন

কোটালীপাড়া প্রতিনিধিঃ গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলায় শিক্ষক কর্মচারী কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন লিমিটেডের নির্বাচনে মোহাম্মদ মতিয়ার হোসেন …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *